আরজ আলী মাতুব্বর






১..ঈশ্বরের রুপ কি?
জগতে প্রায় সকল ধর্মই একথা স্বীকার করেছে যে, ঈশ্বর অদ্বিতীয়, নিরাকার ও সর্বব্যাপী। কথাগুলো অতি সহজ ও সরল, কিন্তু যখন হিন্দুদের মুখে শোনা যায় যে, সৃষ্টি পালনের উদ্দেশ্যে ভগবান মাঝে মাঝে সাকারও হয়ে থাকেন ও যুগে যুগে অবতার রূপে পৃথিবীতে জন্মগ্রহণ করে লীলা প্রকাশ করেন এবং যখন খ্রিস্টানদের নিকট শোনা যায় যে, পরমসত্তা- ভগবান, মসীহ, পরমাত্মা এই ত্রীত্বে প্রকাশ পাচ্ছে; আবার যখন মুসলিম ধর্ম যাজকদের নিকট শোনা যায় যে; আল্লাহ তালা আরশির উপর বসে রেজওয়ান নামক ফেরেশতার সাহায্যে দোজক, জিব্রাইল এর সাহায্যে সংবাদ এবং মেকাইল কে দিয়ে খাদ্য ও আবহাওয়া পরিচালনা করেন-তখনই ধাঁধায় পড়ে বুদ্ধি এলোমেলো হয়ে যায়। মনে প্রশ্ন জাগতে থাকে- নিরাকার সর্বশক্তিমান ভগবানের সৃষ্টি পালনে সাখার হতে হবে কেন? অদ্বিতীয় ঈশ্বরের মহত্ব প্রকাশের ত্রিত্বের আবশ্যক কি? সর্বব্যাপী আল্লাহতালার স্থায়ী আসনে অবস্থান কিরুপ এবং বিশ্ব জগতের কার্য পরিচালনার জন্য ফেরেস্তার সাহায্যের আবশ্যক কি?

২..ঈশ্বর কি মনুষ্যভাবাপন্ন?

ঈশ্বর দেখেন, শোনেন,ও বলেন। ইত্যাদি শুনার পরে সাধারণ মানুষের মনে শত প্রশ্ন জাগে-তবে কি ঈশ্বরের চোখ, কান, ও মুখ আছে? কেউ কেউ বলে থাকেন যে, ঈশ্বর অন্যায় দেখলে ক্রদ্ধ হন, পাপিদের ঘৃণা করেন, কোনো কোনো কাজে খুশি হন ও কোনো কোনো কাজে বেজার হন। তখন মানুষ ভাবে-খোদার কি মানুষের মতই মন আছে? আর খোদার মনোবৃত্তিগুলি কি মানুষেরই অনুরুপ? সেটারও উত্তর আসে যে, তা বুঝার ক্ষমতা মানুষের নাই। আবার যখন চিন্তা করা যায় যে, ঈশ্বরের জগত শাসন প্রণালী বহুলাংশে একজন সম্রাটের মত কেন এবং তাহার এত আমলা কর্মচারীর বাহুল্য কেন? তার উত্তর পাওয়া যায় যে, সম্রাট হলে তিনি অদ্বিতীয় সম্রাট, বাদশাহের বাদশাহ,ক্ষমতা তাহার অসীম।উত্তর পাওয়া গেল, তাতে অসাধারণ যাহাদের মনীষা তারা হয়তো বুঝলেন, কিন্তু সাধারণ মানুষ এতে কিছু বুঝতে পারল কি?

৩..স্রষ্টা কি সৃষ্ট হতে ভিন্ন?

ঈশ্বর যদি তার সৃষ্ট পদার্থ হতে ভিন্ন হন, তাহলে তার সর্বব্যাপী তত্ত্ব থাকতে পারেনা এবং ঈশ্বরের সর্বব্যাপী অক্ষুন্ন থাকলে কোন সৃষ্ট পদার্থ এমন কি পদার্থের অনু-পরমানু ও ঈশ্বর শুন্য হতে পারে না। অর্থাৎ বিশ্বের যাবতীয় পদার্থ ঈশ্বরময়।মূলকথা- ঈশ্বর ঈশ্বরময়।
ধর্ম যদিও ঈশ্বরের সর্বব্যাপীত্বে সন্দেহ করে না। কিন্তু একথাও নিঃসংশয়ে বিশ্বাস করেনা যে, জগতের যাবতীয় জৈব-অজৈব, পাক এবং নাপাক সকল বস্তুই ঈশ্বরে ভরপুর। বিশ্বাস যদি করত ,তবে নাপাক বস্তুকে ঘৃণা করবার কারণ কি? এখন উভয়সংকট হতে ধর্মে বিশ্বাস বাঁচাইয়া রাখার উপায় কি?

৪..ঈশ্বর কি স্বেচ্ছাচারী না নিয়মতান্ত্রীক?

‘নিয়মতন্ত্র হল কোন নির্ধারিত বিধান মেনে চলা এবং সেটা উপেক্ষা করাই হল ‘স্বেচ্ছাচারিতা’। ঈশ্বর স্বেচ্ছাচারী হলে তার মহত্বের লাঘব হয় এবং নিয়মতান্ত্রিক হলে তিনি তার ভক্তদের অনুরোধ রক্ষা করেন কিভাবে?
সুপারিশ রক্ষার অর্থ হল, আপন ইচ্ছার বিরুদ্ধে কোনো কাজ করা। অর্থাৎ স্বয়ং যা করতেন না, তা করা। ঈশ্বর কি কোনো ব্যক্তি বিশেষের অনুরোধ বা সুপারিশে আপন ইচ্ছার বিরুদ্ধে কোনো কাজ করবেন না?

৫..ঈশ্বর ন্যায়বান না দয়ালু?

অন্যান্য ক্ষেত্রে যাহাই হোক না কেন, বিচারক্ষেত্রে ন্যায় ও দয়ার একত্র সমাবেশ অসম্ভব। কেননা দয়া করলে ন্যায়কে উপেক্ষা করতে হবে, এবং ন্যায়কে বজার রাখতে হলে দয়া মায়া বিসর্জন দিতে হবে। বলা হয় যে,ঈশ্বর ন্যায়বান ও দয়ালু। এটা কিরুপে সম্ভব? তবে কি তিনি কোনো ক্ষেত্রে ন্যায়বান আর কোনো ক্ষেত্রে দয়ালু?

৬..ঈশ্বরের অনিচ্ছায় কোনো ঘটনা ঘটে কি?

বলা হয় যে, ঈশ্বরের অনিচ্ছায় কোনো ঘটনা ঘটেনা। এমনকি গাছের পাতাও নড়েনা। বিশেষতঃ তার অনিচ্ছায় যদি কোনো ঘটনা ঘটতে পারে, তা হলে তার ‘সর্বশক্তিমান’ নামের স্বার্থকতা কোথায়? আর যদি ঈশ্বরের ইচ্ছায় সকল ঘটনা ঘটে ,তবে জীবের দোষ বা পাপ কি?

৭..নিরাকারের সাথে নিরাকারের পার্থক্য কি?

‘ঈশ্বর’ নিরাকার এবং জীবের প্রাণও নিরাকার। যদি উভয়ই নিরাকার হয় ,তবে ঈশ্বর এবং প্রাণ এই দুইটি নিরাকারের মধ্যে পার্থক্য কি?

৮..নিরাকার পদার্থ দৃষ্টিগোচর হয় কিভাবে?

ধর্মযাজকদের নিকট শোনা যায় যে, বেহেস্তে বিশ্বাসীগণকে ঈশ্বর ( নুর ও আলোরুপে ) দর্শন দান করবেন।যিনি চির অনন্ত,চির অসীম, তিনি কি চির নিরাকার নহেন?
বিজ্ঞানীদের মতে,স্থুল অথবা সুক্ষ্ম, যে যেরুপেই হোকনা কেন, কোনরকম পদার্থ না হলে তা দৃষ্টিগোচর হয়না। আলো একটি পদার্থ। তার গতি আছে এবং ওজনও আছে। নিরাকার ঈশ্বর যদি তার ভক্তদের মনোরঞ্জনের জন্য নুর বা আলো রুপ গ্রহণ করতে পারেন, তা হলে হিন্দুদের ভগবানের ভিন্ন ভিন্ন রুপে আত্মপ্রকাশে অর্থাৎ অবতারে দোষ কি?

৯..স্থান, কাল ও শক্তি-সৃষ্ট না অসৃষ্ট?

একথা সত্য যে,সৃষ্টিকর্তা বলে যদি কেউ থাকেন,তবে তিনি হবেন এক ও অদ্বিতীয়। কিন্তু ধর্ম জগতে তাকে বিচিত্র করা হয়েছে বিবিধ রুপে এবং তার সংজ্ঞা ও সংখ্যা সব ক্ষেত্রে এক রকম নয়। বিশেষতঃ ধর্মরাজ্যে তার পরিচয় পাওয়া যায় অনেক ক্ষেত্রেই ব্যক্তিরুপে। বলা হয় যে, ঈশ্বর অনাদি,অনন্ত,অসীম ও নিরাকার। অথচ প্রত্যক্ষে না হলেও পরোক্ষে তার চোখ, মুখ ও কান আছে। তার আবাস পাওয়া যায় অনেক ক্ষেত্রে। এমনকি তার পুত্র-কন্যা-পরিবারেরও বর্ণনা পাওয়া যায় কোনো কোনো ক্ষেত্রে।
সৃষ্টিকর্তা হলেন যিনি সৃষ্টি করেন বা করেছেন। কোন সৃষ্ট পদার্থ স্রষ্টার চেয়ে বয়সে অধিক হতে পারেনা। এমনকি সমবয়সিও না। কোনো কুমার একটি হাড়ি তৈরী করল, এক্ষেত্রে হাড়ি কখনো কুমারের বয়োজ্যোষ্ট বা সমবয়সী হতে পারেনা। অর্থাৎ কর্তার আগে কর্ম অথবা কর্তা ও কর্ম একই মুহুর্তে জম্ম নিতে পারেনা। এটাই স্বতঃসিদ্ধ নিয়ম।
কোনো পদার্থের সৃষ্টিকাল যতই অতীত বা মহাতীত হোকনা কেন, তা কখনো অনাদি হতে পারেনা। যা সৃষ্টি তা নিশ্চয় কোনো এক সময়ে উৎপত্তি হতে থাকবে। কিন্তু বিশ্বে এমন কোনো কোনো বিষয় আছে, আমরা যার আদি,অন্ত, সীমা ও আকার কল্পনাও করতে পারিনা। যেমন-স্থান,কাল ও শক্তি। বলা হয়ে থাকে যে,ঈশ্বর অনাদি,অনন্ত, অসীম ও নিরাকার। পক্ষান্তরে স্থান, কাল এবং শক্তিও অনাদি, অনন্ত, অসীম ও নিরাকার। যথাক্রমে এ বিষয় আলোচনা করতেছি।

( ক ) স্থানঃ

বিশেষ দৃশ্যাদৃশ্য যাবতীয় পদার্থই কোনো না কোনো স্থানে অবস্থিত আছে। স্থান পদার্থ পূর্ণ অথবা পদার্থ শুন্য। দুইই থাকতে পারে। কিন্ত স্থানকে থাকতেই হবে। বিশ্বের যাবতীয় পদার্থই কোনো না কোনো সময়ে উৎপত্তি হয়েছে। এমকি পবিত্র বাইবেল গ্রন্থে সৃষ্টির দিন তারিখও দেওয়া আছে। সে যাই হউক,কোনো কিছু বা সবকিছু সৃষ্টির পুর্বে পদার্থ শুন্য থাকলেও যে, স্থান ছিলনা তা কল্পনা করা যায়না। সুতরাং বলতে হয় যে, স্থান অনাদি। পৃথিবী ও অন্যান্য গ্রহ নক্ষত্রাদি সৃষ্টি হয়ে কোনো স্থানে অবস্থান করতেছে। এবং তারা বিলয় হলেও ঐ স্থানগুলোতেই থাকবে। কেননা শুন্য স্থান কখনো বিলয় হতে পারে না। সুতরাং বলতে হয় যে, স্থান অনন্ত।
পরম বিজ্ঞানী আইনস্টাইন বলেছেন “ বিশ্ব অসীম অথচ সসীম”। অর্থাৎ নক্ষত্র নিহারিকাগুলির পার্থিব জগত সসীম,কিন্তু স্থান অসীম। বিশ্বের শেষ প্রান্ত বলে এমন কোনো সীমারেখা কল্পনা করা যায়না, যার বর্হিভাগে আর স্থান নেই। সুতরাং স্থান অসীম।
আমরা দেখতে বা অনুভব করতে পারি শুধু পদার্থকে, স্থানকে নয়। স্থান পদার্থের মত লাল, কালো,সবুজ ,লম্বা – চওড়া ইত্যাদি আকৃতিবিশিষ্ট নয়। স্থানের কোনো অবয়ব নেই। তা আকৃতিহীন ও অদৃশ্য। অর্থাৎ নিরাকার।

( খ ) কালঃ

কাল বা সময়কে আমরা দেখতে পাই না। দেখতে পাই শুধু ঘটনাকে। কেউ কেউ বলেন যে, কাল বা সময় নামে কোনো কিছু নেই। কাল হলো ঘটনা পর্যায়ের ফাঁক মাত্র। সাধারনত কালকে আমরা তিনভাগে ভাগ করি। যথাঃ ভুত,ভবিষ্যৎ এবং বর্তমান। কিন্তু কেউ কেউ বলেন যে,বর্তমান নামে কোনো কালই নেই। কেননা কাল সততই গতিশীল। যা গতিশীল তার স্থিরতা বা তার বর্তমানতা অসম্ভব। ভবিষ্যৎ হতে কাল তীব্রগতিতে আসে এবং নিমিষে অতীতে চলে যায়। এক সেকেন্ডকে হাজার ভাগ করলে যে সময়টুকু পাওয়া যায়,সেই সময়টুকু কাল দাঁড়াইয়া থাকেনা। বর্তমান নামে আখ্যায়িত হবার প্রত্যাশায়। বর্তমান হল অতীত এবং ভবিষ্যতের সন্ধিস্থল মাত্র। তার কোনো বিন্দুতেই কাল এতটুকু স্থিত বা বর্তমান থাকেনা। তবে আমরা যে বর্তমান যুগ ,বর্তমান বছর,বর্তমান ঘটনা ইত্যাদি বলে থাকি,সেটা হল-অতীত এবং ভবিষ্যতের সংমিশ্রণ। যাক সে কথা।
ঈশ্বর জগত সৃষ্টি করেছেন কোন এক সময়। কিন্তু সময়কে সৃষ্টি করেছেন তার কোনো হদিস পাওয়া যায় না। এরূপ কল্পনা করা মোটেই কষ্টকর নয় যে, এমন একটি সময় ছিল সৃষ্টি কোনরূপ সৃষ্টি ছিল না, কিন্তু সৃষ্টির পূর্বে যে কাল ছিল না তা কল্পনা করা যায় না। কাজেই বলতে হয় যে কাল অনাদি। পক্ষান্তরে – মহাপ্রলয়ে সমস্ত সৃষ্টি ধ্বংস হওয়ার পরে কাল আর থাকবেনা। তাও মানব কল্পনার বাইরে। সুতরাং বলতে হয় যে, কাল অনন্ত।
বিশ্বে-মহাবিশ্বে অথবা আরও বাইরে এমন কোনো জায়গা নেই যে, যেখানে কাল নেই। কালকে কোনো স্থানে সীমিত রাখা যায়না। সুতরাং কাল অসীম। অধিকিন্তু কাল নিরাকারও বটে।

( গ )শক্তিঃ

শক্তি বলতে আমরা বুঝি যে,ওটা কাজ করার মত ক্ষমতা। শক্তিকে জানতে হলে বেশী দুর যেতে হয়না। কেননা সেটা আমাদের নিজেদের মধ্যেই আছে। যার সাহায্যে আমরা উঠা-বসা,চলা-ফেরা, ও নানারকম কাজকর্ম করে থাকি। কিন্ত শুধু গায়ের শক্তিতেই সকল রকম কাজ করা যায়না। অন্যান্যরকম শক্তিও দরকার। গায়ের শক্তিতে কোনো কিছু দেখা বা শোনা যায়না, গায়ে জোর থাকা সত্তেও অন্ধ বা বধির ব্যক্তিরা দেখেনা বা শোনেনা। তার জন্য চাই দর্শন ও শ্রবণ শক্তি। শুধু তাই নয়, আরো অনেক রকম শক্তি আমাদের দরকার এবং তা আছেও। যেমন…বাকশক্তি,ঘ্রাণশক্তি,স্পর্শ শক্তি,ধীশক্তি, মনশক্তি ইত্যাদি। এবং সর্বোপরি জীবনীশক্তি। আমাদের দেহের মধ্যে যেমন রকম-রকম শক্তি আছে, তেমন প্রকৃতির রাজ্যেও নানাবিধ শক্তি আছে। যেমন…তাপ শক্তি,আলোক শক্তি, বিদ্যুৎ শক্তি,রাসায়নিক শক্তি ইত্যাদি।
বস্তু জগতে এমন কোনো বস্তু নেই যার মধ্যে কোনোরকম শক্তি নেই। সামান্য একটি দুর্বাপত্রেরও রোগ নিরাময় করার জন্য শক্তি আছে। মূল কথা এই যে, এই জগতটিই শক্তির লীলাখেলা। অর্থাৎ-শক্তি জগৎময় এবং জগৎ শক্তিময়।
বিজ্ঞানী প্রবর আইনস্টাইন বলেছেন যে, পদার্থ শক্তির রুপান্তর মাত্র। শক্তি সংহত হয়ে,হয় পদার্থের উৎপত্তি এবং পদার্থের ধ্বংসে হয় শক্তির উদ্ভব। কি পরিমাণ শক্তির সংহতিতে কি পরিমাণ পদার্থ এবং কি পরিমাণ পদার্থ ধ্বংসে কি পরিমাণ শক্তির উদ্ভব হতে পারে, তা তিনি অংকের সাহায্যে দেখিয়েছেন। তিনি বলেছেন যে, একটি মটর পরিমাণ পদার্থকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করতে পারলে সেটা হতে যে শক্তির উদ্ভব হবে তা দিয়ে বড় ধরনের একটি মালবাহী জাহাজ চালানো যাবে লন্ডন হতে নিউইয়র্ক পর্যন্ত। আইনস্টাইনের এই সুত্র ধরে অধুনা হয়েছে পারমানবিক শক্তির আবিস্কার। এতে জানা যাচ্ছে যে, এই জগতে জৈবাজৈব সমস্ত পদার্থই শক্তির রুপান্তর। অর্থাৎ জগতের সবকিছু সৃষ্টির মূলে রয়েছে শক্তি।
কোনোরুপ কাজ করতে হলে আগে চাই সেই কাজটি সমাধা করার মত শক্তি। অর্থাৎ শক্তি আগে কাজ পরে। এই জগত ঈশ্বর সৃষ্টি করেছেন এবং সেই সৃষ্টি কাজেও তার আবশ্যক হয়েছিল শক্তির। যখন হতে ঈশ্বর আছেন তখন হইতে তার শক্তিও আছে। আমরা এমন একটি সময়কে কল্পনা করতে পারিনা, যখন ঈশ্বর ছিলেন অথচ তার শক্তি ছিলনা। ঈশ্বর অনাদি ,কাজেই শক্তিও অনাদি। পক্ষান্তরে আমরা এমন একটি সময়কে কল্পনা করতে পারিনা, যখন কোনোরুপ পদার্থ না থাকলেও শক্তি থাকেবেনা। কাজেই মানতে হয় যে, শক্তি অনন্ত।
কোনো পদার্থ বা পদার্থের অণু-পরমাণু্ও যেমন শক্তিবিহীন নয়,তেমনি সৌর জগত,নক্ষত্র বা নীহারিকা জগত অথবা তার বর্হিদেশেরও কোথাও শক্তিবিরল জায়গা নেই। শক্তি কোন স্থানে সীমিত নয়। অর্থাৎ শক্তি অসীম।তাপশক্তি, বিদ্যুৎ শক্তি, চুম্বক শক্তি ইত্যাদি নানাবিধ শক্তির আমরা ক্রিয়া দেখতেছি। কিন্ত কখনো শক্তিকে দেখতে পাইতেছিনা। আমরা প্রাণশক্তি বলে বেঁচে আছি এবং নানারকম কাজকর্ম করতেছি। কিন্ত প্রাণশক্তিকে দেখতে পাইতেছিনা। কেননা ,শক্তির কোনো আকার নেই। শক্তি নিরাকার।
এযাবত যে সমস্ত আলোচনা করা হল, তাতে মনে হয় যে, ঈশ্বর যেমন অনাদি,অনন্ত,অসীম ও নিরাকার। তেমনই স্থান,কাল, ও শক্তি এরা সকলেই অনাদি, অনন্ত,অসীম ও নিরাকার। এখন প্রশ্ন এই যে এরা কি সৃষ্ট না অসৃষ্ট? অর্থাৎ ঈশ্বর কি এদেরকে সৃষ্টি করেছেন না অনাদিকাল হইতে এরা স্বভাবতই বিদ্যমান আছে? যদি বলা হয় যে, এরা স্বভাবতই বিদ্যমান আছে, তাহলে এরা ঈশ্বরের সৃষ্ট নয়; এবং যদি বলা হয় যে, এরা ঈশ্বরের সৃষ্ট-তবে পরমেশ্বর স্থানকে সৃষ্টি করলেন কোন স্থানে থেকে? কালকে সৃষ্টি করলেন কোন কালে এবং শক্তিকে সৃষ্টি করলেন কোন শক্তির দ্বারা?

১০..সৃষ্টি যুগের পূর্বে কোন যুগ?

ধর্মীয় মতে, হঠাৎ পরমেশ্বরের খেয়াল হল যে, তিনি সৃষ্টি করবেন জীব ও জগত। তিনি আদেশ দিলেন, হয়ে যাও-অমনি হয়ে গেল জগত এবং পশুপাখি,গাছ-পালা,কীট-পতঙ্গ ও মনুষ্যাদি সবই। বিশ্বচরাচরের যাবতীয় সৃষ্টিকার্য শেষ হতে সময় লাগল মাত্র ছয়দিন(6)।কিন্ত অনাদিকাল নিষ্ক্রীয় থেকে পরমেশ্বর হঠাৎ সক্রিয় হলেন কেন ধর্মযাজকগন সেটা ব্যাখ্যা করেন না।
জীব ও জগত সৃষ্টির পর হতে বর্তমান কাল পর্যন্ত সময়কে মানুষ কয়েকটি ভাগে বিভক্ত করেছে। সেগুলোর এক এক ভাগকে বলা হয় এক একটি যুগ। হিন্দু শাস্ত্র মতে যুগ চারটি। যথাঃ 1..সত্য2..ত্রেতা,3..দ্বাপর এবং 4..কলি। সেগুলোর ব্যাপ্তিকাল যথাক্রমে- সত্যযুগ-17,28,000 ত্রেতা যুগ-12,96,000 দ্বাপর যুগ-8,64,000 এবং কলি যুগ-4,32,000 বৎসর। আলোচ্য যুগ চতুষ্টয়ের মোট বয়সের পরিমাণ 43,20,000 বৎসর। কিন্ত কলি যুগটি শেষ হতে এখনো প্রায়4,27,000 বৎসর বাকি আছে। সুতরাং আলোচ্য যুগ চতুষ্টয়ের অতীত বয়স মাত্র 38,93,000 বৎসর। [ এটি বিজ্ঞানীদের সর্বাধুনিক প্লিষ্টোসেন উপযুগটিরও সমান নয়। এই উপযুগটির বর্তমান বয়স প্রায় 50,00,000 বৎসর ]
পবিত্র বাইবেলের গ্রন্থ মতে, জীব ও জগত সৃষ্টি হয়েছে খ্রীষ্টপুর্ব 4004 সালে। এবং বর্তমানে খ্রীষ্টপুর্ব ১৯৭২[ বইটি লেখার সময়কাল ] সুতরাং এই মতে জগতের বর্তমান বয়স 5976 বৎসর। অর্থাৎ প্রায় ছয় হাজার বৎসর ( এটি হাস্যকররুপে অল্প )।
কাইপারাদি জ্যোতি বিজ্ঞানীদের মতে,প্রায় 500 কোটি বৎসর পুর্বে আমাদের সুর্য্যের সৃষ্টি হয়েছিল এবং তারও 500 কোটি বৎসর পুর্বে সৃষ্টি হয়েছিল আমাদের নক্ষত্র জগত। কোন কোন বিজ্ঞানীদের মতে আমাদের পৃথিবীর বয়স 400 কোটি বসর। উক্ত চারশত কোটি বৎসরকে বিজ্ঞানীগন কয়েকটি যুগ বা উপযুগে বিভক্ত করেছেন। এখন হতে 50 কোটি বৎসর পুর্বের যাবতীয় সময়কে একত্রে বলা হয়‘ প্রাক ক্যামব্রিয়ান মহাযুগ ’( Archaeo Zoic )। এই যুগের প্রথম দিকে পৃথিবীতে কোনরুপ জীব বা জীবনের অস্তিত্ব ছিলনা। এই যুগটি অতিবাহিত হয়েছিল জ্বলন্ত পৃথিবী নির্বাপিত হয়ে তরল ও কঠিন হইতে এবং উত্তাপ কমে গিয়ে জল-বায়ু সৃষ্টি হয়ে প্রাণীদের যুগ। ( Placo Zoic ) 31 কোটি বছর। মধ্যজীবিয় যুগ বা সরীসৃপদের যুগ( Meso Zoic ) 12 কোটি বৎসর ও নবজীবীয় যুগ বা স্তন্যপায়িদের যুগ ( Caino Zoic ) 7 কোটি বৎসর ( এই যুগটি এখনো চলতেছে )।
জীব বিজ্ঞানীদের মতে, প্রাক ক্যামব্রিয়ান মহাযুগের শেষের দিকে পৃথিবীতে জীবন বা জীবের সুত্রপাত হয়েছিল মাত্র এবং সেটি ক্রমবিবর্তনের মাধ্যমে বর্তমান রুপ পেয়েছে নবজীবীয় যুগে। এই যুগেই হয়েছে পশু, পাখি,মানুষ ইত্যাদি উন্নতমানের জীবের আবির্ভাব।
আলোচ্য যাবতীয় যুগের ব্যাপ্তিকাল কোনো মতে মাত্র ছয় হাজার বৎসর এবং কোনো মতে এক হাজার কোটি বৎসর। ধর্ম বা বিজ্ঞান , যে কোন মতেই হোক না কেন সৃষ্টির পর হতেই যুগ গণনা করা হয়ে থাকে। তাই সামগ্রিকভাবে এটিকে আমরা বলতে পারি ‘ সৃষ্টি যুগ ’। এই সৃষ্টি যুগেই দেখা যায় সৌরজগত,নক্ষত্র জগত ইত্যাদির পরিচালন এবং জীবজগতের রক্ষণাবেক্ষন ও ভরণ-পোষণ ইত্যাদি পরমেশ্বরের যত সব কর্ম তৎপরতা।
ঈশ্বর অনাদি এবং কালও অনাদি। কিন্ত যুগসমূহ অনাদি নয়,সেগুলো সাময়িক। যখন হতে ঈশ্বর আছেন, তখন হতে কালও আছে। সেই অনন্ত কাল এর সাথে কয়েক হাজার বা কোটি বৎসর সময়র তুলনাই হয়না। এমন এক কাল নিশ্চয়ই ছিল, যখন কোনরুপ সৃষ্টিই ছিলনা। সেই অনাদি কালকে আমরা বলতে পারি ‘ অনাদি যুগ ’ বা ‘অ-সৃষ্ট যুগ’। সেই অনাদি-অসৃষ্ট যুগে পরমেশ্বর কি করতেন?

১১..ঈশ্বর কি দয়াময়?

‘দয়া’ একটি মহৎ গুণ। এই গুণের অধিকারীকে বলা হয় ‘দয়াবান’। মানুষ দয়াবান হইতে পারে দয়াময় হইতে পারেনা। কেননা মানুষ যতই ঐ গুণটির অধীকারী হোকনা কেন,সেটিতে পূর্ণতা লাভ করতে পারেনা। আর ঈশ্বর ঐ গুণে পূর্ণ। তার তার একটি নাম ‘দয়াময়’।

“ কোনো ব্যক্তি যদি একজন ক্ষুধার্তকে অন্নদান ও একজন পথিকের মাল লুণ্ঠন করে, একজন জল মগ্নকে উদ্ধার করে ও অন্যকাউকে হত্যা করে অথবা একজন গৃহহীনকে গৃহদান করে এবং অপরের গৃহ করে অগ্নিদাহ-তবে তাকে ‘ দয়াময় ’ বলা যায় কি? হয়ত এর উত্তর হবে – “ না ”। কিন্তু উক্তরুপ কার্যকলাপ সত্বেও ঈশ্বর আখ্যায়িত আছেন ‘ দয়াময় ’ নামে। এখন সে বিষয়ে একটু আলোচনা করে দেখা যাকঃ
জীব জগতে খাদ্য খাদক সম্পর্ক বিদ্যমান। যখন কোনো সবল প্রাণী দুর্বল প্রাণীকে ভক্ষণ করে, তখন ঈশ্বর খাদকের কাছে ‘ দয়াময় ’ বটে কিন্ত তখন তিনি খাদ্য প্রাণীর কাছেও ‘ দয়াময় ’? যখন একটি সর্প একটি ব্যাঙকে ধরিয়া আস্তে আস্তে গিলিতে থাকে, তখন তিনি সর্পটির কাছে দয়াময় বটে, কিন্ত সর্পটির কাছে নির্দয় নহেন কি? পক্ষান্তরে তিনি যদি ব্যাঙটির প্রতি সদয় হন, তবে সর্পটি অনাহারে মারা যায় না কি?
ঈশ্বর এক জীবকে অন্য জীবের খাদ্য নির্বাচন না করে নির্জীব পদার্থ অর্থাৎ সোনা,রুপা,লোহা, তামা, মাটি পাথর ইত্যাদি নির্বাচন করতে পারতেন কি না? না পারলে কেচোঁর খাদ্য মাটি হইল কিভাবে?
ঈশ্বরের সৃষ্ট জীবেরা সকলেই তার দয়ার সমানাংশ প্রাপ্তির দাবিদার। কিন্ত সেটা পাচ্ছে কি? খাদ্য সম্বন্ধে বলা যায় যে,ঈশ্বর মানুষের জন্য চর্ব্য,চোষ্য,লেহ্য ,পেয় ইত্যাদি অসংখ্য রকম খাদ্যের ব্যবস্থা করেছেন, এবং পশু পাখিদের জন্য বরাদ্দ করেছেন ঘাস-বিচালী, পোকা-মাকড় আর কুকুরের জন্য বিষ্টা। এটাকে ঈশ্বরের দয়ার সমান বণ্টন বলা যায় কি?
কাহারও জীবন রক্ষা করা যদি দয়ার কাজ হয় এবং হত্যা করা যদি হয় নির্দয়তার কাজ, তাহলে খাদ্য-খাদক ব্যাপারে ঈশ্বর ‘ সদয় ’ এর চেয়ে নির্দয়ই বেশী। তবে কতগুন বেশী, তা তিনি ছাড়া আর কেউ জানে না। কেন না তিনি এক একটি জীবের জীবন রক্ষা করার উদ্দেশ্যে অসংখ্য জীবকে হত্যা করে থাকেন। কে জানে একটি মানুষের জীবন রক্ষার জন্য তিনি কয়টি মাছ,মোরগ, ছাগল ইত্যাদি হত্যা করেন। কে জানে তিনি একটি শৌল,গজাল,বোয়াল মাছ এবং একটি বক পাখির জীবন রক্ষার উদ্দেশ্যে কয়টি চুনো মাছ হত্যা করেন? আমিজ ভোজী জীবদের প্রতি ঈশ্বরের এত দয়া কেন? তিনি কি হতভাগাদের ‘দয়াময়’ নহেন?

বলা হইয়া থাকে যে, মানুষ ঈশ্বরের সখের সৃষ্ট জীব। তাই মানুষের উপর তার দয়া-মায়াও বেশী। কিন্ত মানুষ ভেদে তার দয়ার তারতম্য কেন? ঈশ্বর দয়া করিয়া সকল মানুষকেই প্রাণ দান করেছেন এবং দান করেছেন ক্ষুধা-তৃঞ্চা ও সুখ-দুঃখের অনুভূতি সমান মাপে। অথচ মানুষের জীবিকা নির্বাহের কোনো ব্যাপারেই ঈশ্বরের দয়ার সম বণ্টন নাই কেন? কেহ সুরম্য হর্মে বাস করে সাততলায় এবং কেহ বা করে গাছতলায়। কেহ পঞ্চামৃত ( দুগ্ধ, দধি, ঘৃত, মধু, চিনি ) আহার করে এবং কেহ জল ভাতে শুধু লবণ ও লঙ্কাপোড়া পাইনা কেন? কেহ লম্প-ঝম্প ও দৌড় প্রতিযোগীতায় রেকর্ড করে, কেহ মল্ল যুদ্ধে পদক পায়; আবার অন্ধ,খঞ্জ,বিকলাঙ্গেরা রাস্তায় বসিয়া অন্যের পায়ের আঘাত পায়। ঈশ্বরের দয়া বণ্টনে এরুপ পক্ষপাতিত্ব কেন? আর ভাগ্য বলে কিছু আছে কি না? থাকলে কারো ভাগ্যে চিরশান্তি নাই কেন? ভাগ্যের নিয়ন্তা কে?
কাহারও জীবন রক্ষা করা দয়ার কাজ বটে,কিন্তু কাউকে হত্যা করাও দয়ার কাজ নয়। বরং সেটা দয়াহীনতার পরিচয়। জগতে জীবের বিশেষতঃ মানুষের জন্মসংখ্যা যত,মৃত্যু সংখ্যা তত। সুতরাং জন্ম ও মৃত্যু ব্যাপারে ঈশ্বর যে পরিমাণ সদয়,সেই পরিমাণ নির্দয়। অর্থাৎ ঈশ্বরের সদয়তা ও নির্দয়তার পরিমাণ একত্রে সমান।
উপরোক্ত আলোচনার প্রেক্ষিতে কেউ কেউ মনে করেন যে, ঈশ্বর সদয়ও নয় এবং নির্দয়ও নয়। তিনি নিরাকার,নির্বিকার ও অনির্বচনীয় এক সত্তা। যদি তা নাই হয়,তবে পৃথিবীতে শিশু মৃত্যু, অপমৃত্যু,এবং ঝড়-বন্যা,মহামারী, ভুমিকম্প ইত্যাদি প্রাণহানীকর ঘটনাগুলির জন্যই তিনিই কি দায়ী নয়?

ব্লগটি পড়ে যদি আপনার ভালো লাগে তাহলে শেয়ার করুন এবং আপনার নাম,জিমেইল লিখে আমাকে কমেন্ট করুন।